আওয়ামী লীগের ৭০তম জন্মবার্ষিকীতে এড. সাহারা খাতুন

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে নিয়ে রোববার সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

উল্লেখ্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসাবে হাল ধরেন শেখ হাসিনা। সে ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের ৭০ বছরের ইতিহাসে অর্ধেকের বেশি সময় তথা ৩৮ বছর ধরে দলের সভাপতির দায়িত্ব ভার বয়ে চলছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলটি ৭০ বছর পেরিয়ে ৭১ বছরে পদাপর্ণ করছে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এদেশের গণমানুষের সংগঠনে পরিণত হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুর কালরাত্রির ঘটনার কালচক্রে পরবর্তীতে দলের সভাপতির গুরুভার নিয়ে ১৯৮১ সালে ১৭ মে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। সেই থেকে আজ অবধি আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব বয়ে চলছেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যেদিন জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, সেদিন শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা, স্বামী ও দুই সন্তানসহ পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। পশ্চিম জার্মানি থেকেই স্ত্রী শেখ হাসিনা, শ্যালিকা শেখ রেহানা এবং শিশু পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও শিশুকন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং প্রাণ রক্ষার জন্য ভারত সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন পরমাণুবিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ মিয়া। সেই কঠিন সময় অতিক্রম করে ২৪ আগস্ট সকালে তাদের ভারতীয় দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নিয়ে যান এবং এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে ২৫ অগাস্ট সকালে দিল্লি পৌঁছান তারা। তাদের ঠাঁই হয় নয়াদিল্লির ডিফেন্স কলোনির একটি বাসায়। ওই সময় ভারতে জারি ছিল জরুরি অবস্থা ছিল।

দিল্লিতে পৌঁছানোর দুই সপ্তাহ পর স্বামী ওয়াজেদ মিয়া এবং শেখ হাসিনা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসায় গেলে সেখানেই ১৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনা জানতে পারেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এরপর তাদের ঠাঁই হয় ইন্ডিয়া গেইটের কাছে পান্ডারা পার্কের ‘সি’ ব্লকের একটি ফ্ল্যাটে। সেখানেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করতে থাকেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। এরপর ওয়াজেদ মিয়াকে ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর ভারতের পরমাণু শক্তি বিভাগে ফেলোশিপ দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই বঙ্গবন্ধুর ছোট কন্যা শেখ রেহানার বিয়ে হয় লন্ডনপ্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং তার স্বামী ওই আর্থিক সংকটের কারণে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি।

১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে আওয়ামী লীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতা বিভিন্ন সময় দিল্লি গিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার খোঁজ-খবর নেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক কাবুল যাওয়ার সময় এবং সেখান থেকে ফেরার সময়ও সাক্ষাৎ করেন। আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান, আব্দুস সামাদ আজাদ, তৎকালীন যুবলীগ নেতা আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী দিল্লি সফর করেন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের হাল ধরার অনুরোধ করেন। এরপর ১৯৮০ সালের ৪ এপ্রিল শেখ হাসিনা সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে যান রেহানার সঙ্গে দেখা করতে।

 

পরের বছর ১৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে থাকা অবস্থায় তিনি খবর পান, ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে এবং এর এক সপ্তাহ পরে আওয়ামী লীগের সেই সময়ের শীর্ষ নেতাদের অনেকে দিল্লি যান। আব্দুল মালেক উকিল, ড.কামাল হোসেন, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মান্নান, আব্দুস সামাদ, এম কোরবান আলী, বেগম জোহরা তাজউদ্দীন, স্বামী গোলাম আকবার চৌধুরীসহ বেগম সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, বেগম আইভি রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ১৯৮১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে দিল্লিতে পৌঁছান এবং সেখানে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়েকটি বৈঠক করেন নেতারা।

 

এরপর ড.কামাল হোসেন ও সাজেদা চৌধুরী ছাড়া অন্য নেতারা ঢাকায় ফিরে আসেন। কামাল ও সৈয়দা সাজেদার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয় তারা শেখ হাসিনার ঢাকা ফেরার তারিখ চূড়ান্ত করবেন। এরপর ১৬ মে শেখ হাসিনা ও তার মেয়ে দিল্লি থেকে একটি ফ্লাইটে কলকাতা পৌঁছান। ১৭ মে বিকালে তারা কলকাতা থেকে ঢাকার পথে রওনা দেন। এসময় তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দুই নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ ও এম কোরবান আলী ছিলেন। সেদিন হাজারো বৈরি আবহাওয়া উপেক্ষা করে হাজার হাজার জনতা ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তেজগাঁওয়ের পুরনো বিমানবন্দর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কন্যাকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হন।

 

সেদিন বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনা যান রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে, সেখানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে এক সমাবেশে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সকলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাদেরকে ফিরে পেতে চাই।’

 

সেই দিন থেকে আজ অবধি হাজারো বাধা অতিক্রম করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্বে দিয়ে সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করে আওয়ামী লীগ সভাপতির গুরুভার নিয়ে দলকে চার বার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে টানা তৃতীয় মেয়াদে তার আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে কখনো তিনি নিজের ক্লান্তির কথা, কখনো অবসরের কথা, কখনো বয়সজিনত সমস্যার কথা, কখনো আগামী দিনে নেতৃত্ব তৈরির কথা বলে অবসর নেওয়ার কথা স্মরণ করে দিয়েছেন। কিন্তু ওনার জীবদ্দশায় আওয়ামী লীগ সভাপতির পদ থেকে অবসর গ্রহণের সুযোগ দিতে না-রাজি দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতারা।

 

গত ২০তম জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনেও তিনি দলের নেতাদের একথা স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু নেতারা শেখ হাসিনার জীবদ্দশায় নতুন নেতৃত্বের হাতে দলের দায়িত্ব দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথা বললেও কাউন্সিলররা তাকেই দায়িত্ব চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। সেদিন শেখ হাসিনা তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে তার সূচনা বক্তব্যে বলেন, ‘আমি চাই যে আমি জীবিত থাকতে থাকতে নতুন ভাবে নেতা নির্বাচিত করে এই সংগঠনকে আরও গতিশীল করার চেষ্টা করবেন। ৩৫ বছর এই দলের সভাপতি। এত লম্বা সময় কেউ কখনো থাকেনি।’ কিন্তু সেদিন শেখ হাসিনার একথায় অধিবেশন মিলনায়তনে উপস্থিত কাউন্সিলররা দাঁড়িয়ে সমস্বরে ‘না, না’ বলে ওঠেন।

ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চার মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে ২০তম জাতীয় সম্মেলনের তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে।

এদিকে, ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রাজধানীজুড়ে আন্দোলন-সংগ্রাম, অর্জন-সাফল্যের বর্ণিল আলোকসজ্জায় সেজেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন দলটি এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্মৃতিবিজড়িত পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেন হয়ে নবাবপুর রোড, নবাবপুর রোড থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ রাজধানীজুড়ে আলোকসজ্জা ব্যানার-ফেস্টুন-বিলবোর্ডে এক অনন্য মাত্রায় সেজে উঠেছে।